
ছেঁড়া তারে পুরনো প্রেমের সুরধ্বনি শুনতে চাওয়ার মতো অন্যায় বোধহয় কিছুই হয় না বলেই আমার মনে হয়। যেমনটা ঘটেছে সীতা ও মনোরম – এর বৈবাহিক জীবন ও পরবর্তীকালে বিচ্ছেদের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘতম সেতুর মতো পাহাড় প্রমাণ অভিমানের শিখরকে গলিয়ে পুনরায় ফিরে আসা প্রেমের স্রোতের টানে ছুটে আসা।
মনোরম একজন ট্রমাটাইজড প্রেমিক, যার প্রেমিকসত্বা বারবার ধাক্কা খেয়েছে প্রশ্নরুপী কল্পনায় আঁকা দৈত্যের মতো ধেয়ে আসা মেয়েদের কাছে এসে। যাদের সে অনায়াসেই প্রেম নিবেদন করে যেত, কবিতা মাখা ভালোবাসার খাতা উপহার দিত বসন্তরঙা গোলাপের রঙে রাঙিয়ে।
সে বিভিন্ন ধরনের চাকুরী করেছিল ঠিকই, কিন্তু কোনোটাই সে স্থায়ীভাবে করে ওঠেনি কারণ কোনোটাই তার ঠিক মনের মতো হয়ে ওঠেনি। কারণ সেই সময় সীতার সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের পরে অ্যালিমনিতে সমস্ত খুইয়ে ফেলার পর।
তাদের মাঝে অভিমানের সুযোগে এল মানস, যাকে সীতা তার জীবনের দ্বিতীয় পুরুষ ভাবতে শুরু করে কিন্তু আসলে তার সত্বা তার মধ্যে মনোরমাকে খুঁজত।যেমন মনোরম ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখে শিশুর মতো তাকে পরম নির্ভরতায় জড়িয়ে ধরত। সে সুন্দর করে সিগারেট খেত -এমনকি সেটাও সীতার পছন্দ ছিল বলে মানসকে সীতা খেতে শিখিয়েছিল নিপুণ দক্ষতায়। অথচ সন্দেহ, অভিমানের সুদৃশ্য প্রাচীর ভেদ করে তারা সত্যিকারের ভালোবাসার আস্বাদনের স্বাদ অনুভব করেনি কারণ তারা সেইখানেই পৌঁছতে পারেনি। কারণ দুজনেই দুজনের কাছে অদৃশ্য ইগোটাই বড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাদের দুজনের ভালোবাসার সম্পর্ক নয়। তাই তার কল্পলোকের মেয়ের মত বলতে ইচ্ছে করছে যে- “সৎ লোকেরা কখনও সুখী হয় না। তুমিও দুঃখী বোধহয়। আর দেখছি তুমি তেমন সবল হওনি, দৃঢ়চেতা হওনি, তাই না। “
তাই বুঝি কল্পলোকে বিচরণ করে নিজের অপূর্ণ ইচ্ছের চাবি ঘুরিয়ে বলে চলো কত কথা, যার কোনো শেষ নেই, নির্দিষ্ট কোনো অর্থ নেই। আছে শুধু পাগলামি। বলে রিনার কথা, যার প্রেমে মনোরম প্রথম পড়েছিল, যার কথা সে সীতাকেও বলেছিল। বলেছিল মেমসাহেব- বউয়ের কথা যে ছিল আদতে এক পুতুল বইকি আর কিছু নয়। রিনার মতো আর একজন ছিল তার জীবনে, যে মাঝরাতে এসে মশারি খুলে তাকে দেখত। যাকে সে কল্পনায় তার দেহ স্পর্শের অধিকার পেয়েছিল। যাকে মনোরম কবিতা শুনিয়েছিল, “মেরিলি দ্যা বেল, অ্যান্ড দে ওয়্যার ওয়েভ…।
তারপর বলেছিল চপলার কথা, যাকে ছাড়া অনাত্মীয়া কোনো মেয়ের গা কখনও ছুঁয়ে দেখেনি। চপলা তাকে চুমু খেয়েছিল, ঠিক যেন সঞ্জীবচন্দ্রের উপন্যাসের আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল ঠিক সেইসময় সেই মুহুর্তে।
অথচ তার জীবনে শুধুমাত্র সীতাই ছিল বাস্তবে প্রেয়সী, স্ত্রী ও জীবনসঙ্গিনী। তার জন্য ব্যবসা, কোম্পানি, টাকা-সোনা ও যাদবপুরের সেন্ট্রাল রোডের জমি সমস্ত কিছু দিয়ে দিতে হয়েছিল বিবাহবিচ্ছেদ – এর খোরপোষ স্বরূপ। তারপর থেকেই তার জীবনের উদ্দেশ্য, গতিপথ যেন সবকিছুই হঠাৎই বদলে গেল।
এরপরে সে হতে চায় কেবল বাবা মায়ের আদরের ঝুমু।
যে বারোমাস অসুখে ভুগেছিল, যার দরুণ রক্তহীন, সাদা ভগভগে এক শিশুর জন্ম হয়েছিল। যার ডান হাতে মাদুলি, গলায় কবচ। যে নির্বোধ, আর একটু অসহায়।
অথচ সে বীরু ওরফে মামাতো ভাইয়ের একজন রক্ষক হিসেবে থেকে যায় সম্পূর্ণ মনোরম হয়ে ওঠার আগেই ঝুমু নামের একজনের পরিচয়ের আড়ালে।
বীরু যে প্রচন্ড বেগে জীবনকে উপভোগ করতে ভালোবাসে। সে মেয়েদের সঙ্গ উপভোগ করে দেবরাজ ইন্দ্রের মতো। তবুও তার মধ্যে কোথাও যেন প্রেমিক সত্বা লুকিয়ে ছিল বেপরোয়া জীবনের উদ্দাম স্রোতে। তাইতো গৌরীর প্রতি তার কোথাও না কোথাও দূর্বলতার আভাস আমরা উপন্যাসে মাঝে মাঝে পাই। তবুও কন্ট্রাসেপটিভের ট্যাবলেট, মেয়েদের সাথে যৌন সম্পর্কের চরম উদ্দামতা তার ছিঁড়ে দিচ্ছিল স্বাভাবিক মানুষ ভাবতে গিয়ে।
এরপর সীতা হঠাৎই সমস্তকিছুই মনোরমকে ফিরিয়ে দিতে চায় কিন্তু অভিমানে সে আর নিতে চায় না।
“কারণ সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা মানুষের হয় তা টাকাপয়সার নয়, বিষয়-সম্পন্তির ও নয়। মানুষ হারায় তার সময়। “
কারণ সম্পূর্ণ দাবিদাওয়া ছেড়ে সে সত্যিই এবারে মুক্ত হতে চেয়েছিল। ছেড়ে যাওয়ার আগে, তাই প্রশ্ন তোলে সে তার মামাকে উদ্দেশ্য করে বলে ” তোমার প্রয়োজন আমাকে, কারণ বীরুর বেপরোয়া জীবনের শেষ নেই বলে, তাকে হারাতে চাইছ না বলে বেঁধে রাখতে চাইছ, ঠিক যেমন করে ভেসে যাওয়ার আগে খড়কুটোর মতন যা কিছু লোকে পাই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। “
কিন্তু তার এখন ঘুমের সময়, মামা যেন তাকে স্বপ্নের মধ্যেও না ডাকে। তাই সে বলে ” আমি উল্টে রেখেছি বই, নিভিয়ে দিয়েছি বাতি। এখন আর কাউকেই আমার কিছু বলার নেই। “
তাই বিশ্বাস যখন বলে ব্যবসা করতেই হবে তার সাথে যেভাবেই হোক, কারণ তার হাতে সময় নেই। তার মারণ রোগ এবার শেষ থাবা মারবে বলে যেন তৈরি হয়ে এসেছে। আর অন্যদিকে তার স্ত্রী ও পুত্রের চিন্তা তাকে দিনরাত অনুতাপে দগ্ধ করে চলেছে প্রতিনিয়তই।
তাই সে বিশেষ আক্ষেপের সুরেই বলে ওঠে ” আমাকে কতকাল অপেক্ষা করতে হবে ব্যানার্জী? মানুষের আয়ুর তো শেষ আছে । “
সবশেষে সে ভাবে বাস্তবে সীতাকে দেখেও তার মনে হয় যে সে কল্পলোক থেকে হেঁটে আসা কোনো প্রেয়সীকে দেখছে।
যে এসে তার পান্ডু রোগা হাতখানা তুলে নিঃসঙ্কোচে বলে ওঠে -দেখো কত রোগা হয়ে গেছি।
“পৃথিবীতে মানুষের আয়ু খুব বেশিদিন নয়, বয়ে যাচ্ছে সময়। দ্রুত কলেবরে। “ মনোরম তাই বিনা প্রশ্নে সীতার রোগা হাতখানা ছুঁল।
সেই মুহুর্তেই তাদের চারধার থেকে কোলকাতা মুছে যাচ্ছিল। জেগে উঠল বনভূমি। অদূরে নদীর শব্দ।
আর এভাবেই শেষ হল অভিমানের সম্পর্কে নতুন শুরুর অভিযানের প্রশ্নের তীরে ধেয়ে আসা আরও এক অপূর্ণ প্রেমের কাহিনীর। ©মেহুল শুনি🍄




